শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ০৬:৪২ পূর্বাহ্ন

যশোর ভৈরব নদে ডাহুক পাখির ডাক

শাহানুর আলম উজ্জ্বল ॥ চলমান করোনা পরিস্থিতি নিয়ে মৃত্যুমুখে মানুষ। গোটা বিশ্ব আজ ভয়াবহ অবস্থা ও বাস্তবতার মধ্যে অতিবাহিত। উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশের অবস্থাও সংকটাপন্ন। ইতিহাসখ্যাত, ডিজিটাল ও দেশের প্রথম জেলা যশোরের মানুষ করোনার মুখোমুখি। চারিপাশে চরম হতাশা আর বিয়গান্তক ব্যাথায় কাতরাচ্ছে। অজানা আতংকে স্তব্ধ মানসপট। নিরাশাময় তরীতে আশা সঞ্চার করে পাড়ি দিচ্ছে করোনা কাল। কী হবে বা কোন পরিনতির দিকে মানব সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে তা সত্যি বলা মুশকিল। কালো ঘোনঘটা একটি অদৃশ্য ভাইরাস যখন তাপিয়ে বেড়াচ্ছে ঠিক তখন কিছু কিছু সংবাদ আমাদেরকে উঠে দাঁড়াতে শক্তি অর্জন করে বৈকি।
বলা হয়ে থাকে, মানবজীবন টিকে থাকার একমাত্র ভরসাস্থল হচ্ছে পরিবেশের ভারসম্যতা। তাই যে দেশ পরিবেশের ভারসম্যতা অক্ষুন্ন রাখে সেই দেশ, সেই মাটি, সেই জনপদ প্রত্যেক প্রাণির জন্য বসবাসযোগ্য। বলছিলাম আশা জাগানিয়ার কথা। যশোর শহরের বুক চিরে একসময়কার প্রমত্তা ভৈরব নদের কথা। নদটি আজ কঙ্কালসার!
বস্তুতঃ এই নদ প্রাকৃতিক পরিবেশ হারিয়ে শতাব্দীর সামনে এখন রোগাক্রান্ত। অবস্থাদৃষ্টে নদের পরিনামের জন্য মানুষ দায়ী। যতেচ্ছাভাবে আমরা ¯্রােতস্বিনী এই নদকে ব্যবহার করেছি। নদের জমি যারপরনাই দখল করে নদের স্বাভাবিক গতিকে আমরা রোধ করেছি। নদ দখল করে গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে বানিয়েছি বহুতল ভবন। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ, বধির, বিকালাঙ্গ ভাবনা চিন্তার অপরিনামদর্শীর ফলাফল হচ্ছে সঙ্কুচিত, প্রায় অস্থিত্বহীন এই ভৈরব নদ। শেষমেষ পানির প্রবাহ হারিয়ে জীববৈচিত্র বিলিন। বরাবরই একসময়কার স্বরব এই নদের প্রতিপক্ষ হচ্ছে মানুষ, এখনো তাই। ফলে আমরা আমাদের ব্যক্তিস্বার্থে নদটি মেরে ফেলেছি। অথচ কয়েকযুগ আগেও নদে ছিল প্রমত্তা ঢেউ। পাখিদের কলকাকলি। জীববৈচিত্রে নদটি ছিল মুখরিত। শত প্রজাতির ছিল মাছ ও জলজ প্রাণি। কিন্তু এখন তা অতীত ইতিহাস।
ক্রমান্বয়ে মানুষের নির্লিপ্ততার পর নদ হারানোর কথাটি ইদানিং আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি। আমরা আমাদের কী পরিমান ক্ষতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছি, এখন হাড়েহাড়ে তা টের পাচ্ছি। ভৈরবের জীবন যৌবন ফিরিয়ে দিতে ভাবতে শুরু করেছি। এই ভাবনার বাস্তবায়ন ও চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যে মৃত প্রায় ভৈরব নদ জেগে উঠতে শুরু করেছে। কিছুটা পানির অবস্থান তৈরি মাত্রই পাখিদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভৈরব নদে শোনা যাচ্ছে ডাহুক পাখির ডাক। ডাহুক পাখি ডাকছে ঠিকই কিন্তু এই ডাকের জন্য বর্তমান সরকারের নান্দনিক ভূমিকা সর্বাগ্রে।
আমরা সকলে জানি, বৃহৎ একটি প্রকল্পের মাধ্যমে নদটির প্রবাহ তৈরি করতে বর্তমান সরকার এগিয়ে আসেন। যে নদটি ছিল যশোর শহরের প্রাণ। সেই নদ এখন মরা খাল। বর্তমান সরকারের সদিচ্ছায় দেশে মৃত প্রায় নদ-নদী পুনর্জ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নদটি বাঁচানোর নিমিত্তে ক্ষমতাসীন, ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটি, সাংবাদিক ও পেশাজীবিদের মাধ্যমে দাবী উত্থাপিত হয়। জেলার উন্নয়ন সমন্বয় সভায় এ নিয়ে বারবার স্বরব আলোচনা হয়েছে। বারংবার উন্নয়ন সভার আলোচ্য কথা ও সিদ্ধান্তের প্রতিলিপি সরকার মহলের সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। শেষমেশ শহরবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২০১৬ সালে যশোরে আগমন করে ভৈরব নদ খননের প্রতিশ্রুতি দেন। ওই প্রতিশ্রুতির ফলে পরবর্তীতে ২৭২ কোটি ৮১ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। ভৈরব নদের টেকসই উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদী “ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প” শুরু করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ৯২ কিলোমিটার খনন কাজ হবে। ইতোমধ্যে নদের উজান ও ভাটির ৭০ কিলোমিটারের বেশি খনন কাজ চলমান।
নদ-নদী বিশেষজ্ঞদের দাবী, ভৈরব নদটি যশোরের চৌগাছা উপজেলার তাহেরপুর থেকে উৎপন্ন হয়ে যশোর শহরের বুক চিরে বাঘারপাড়া, অভয়নগর হয়ে খুলনার রূপসা নদীতে মিলিত হয়েছে। তবে চুয়াডাঙ্গা জেলার মাথাভাঙ্গা নদের সাথে ভৈরব নদের যোগসূত্র আছে। কালক্রমে এ জেলার দামুড়হুদা থেকে চৌগাছার তাহেরপুর পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটার নদটি ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পানি প্রবাহের পথটি স্তব্ধ হয়ে যায়। ভৈরব নদ সংস্কারে সরকারের ভূমিকা আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে যশোর জেলার মানুষের কাছে।
ভৈরব নদটি ঘিরে বৃহৎ উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়। আর এই আলোচনা সমালোচনা ভৈরব নদের প্রাণশক্তি ফিরে পেতে সহায়ক ভূমিকায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। এই কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে নদটি। এরই মধ্যে দেখা মিলছে সম্ভাবনার নানান দিক। ভৈরব নদের পাড়েই যশোর কালেকটরেট ভবন। নদের তীর ঘেষে উত্তর-পূর্বকোণে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। আমার সহধর্মিনী সেঁজুতি নূরকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রেক্ষিতে ৮ দিন আমাকে যশোর শহরে অবস্থান করতে হয়। আত্মীয় স্বজন, পরিজন, বন্ধু থাকা সত্বেও রোগীর পাশে থাকার নিমিত্তে হাসপাতালের সামনে বে-সরকারী একটি ক্লিনিকের তৃতীয় তলায় একটি রুম নিয়ে আমার কিছুদিনের রাত্রিবাস। রুমের সামনে ব্যলকনি। ব্যলকনির দক্ষিণের যশোর ভৈরব নদের শরীর দেখা যায় স্পষ্ট। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও রাত্রকালীন টুকটাক চলছে মটরবাইক বা ছোটখাট খাদ্য বা ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন। শহরের প্রাণকেন্দ্র আলোকময়। সারাদিন রোগী নিয়ে দৌঁড়াদৌড়ির পর অনেকটা ক্লান্ত। শরীর অবশ। ঘুমের আচ্ছাদনে শরীরটি নেতিয়ে গেল বিছানায়। রাত ২ টা। হঠাৎ উচ্চ একটি শব্দ আমার কর্ণকুহরকে ফাটিয়ে ফেলছে। ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে বসে কান পাতলাম বাতাসে। খুব পরিচিত একটি শব্দ। ছোটবেলায় ঘুরে বেড়ানো ডোবা, পুকুর, নদ-নদী, বিল বাওড়ে বহুবার শুনেছি এই শব্দটি। এই শব্দটি প্রত্যেক মানুষের কাছে খুব চেনা। কেননা এমন শব্দ রোমন্থণ করেছেন সকলেই। নিতান্তই তিনি যদি বধির না হন। খুব উপভোগ করলাম এই শব্দ শুনে। একের পর এক ডেকেই যাচ্ছে ডাহুক পাখি। একপর্যায় সমুস্বরে কয়েকটি পাখির একসাথে ডাকাডাকি। মনে হচ্ছে তাদের মিলন মেলা বসেছে। তাদের নগরটি যেন উৎসবের। সত্যিতো তাদের নগর বলতে ভৈরব নদটি। যে নদ ছিল মরাখাল বা মৃত। দুর্গন্ধ আর কালোযুক্ত কাদাময় পানি ছিল বিষাক্ত। সেখানে এখন ডাহুক পাখি ডাকাডাকি করছে। বেড থেকে উঠে ব্যলকনিতে দাঁড়ালাম। ঘন্টাখানিক আগে ঝরঝর করে বৃষ্টি হয়েছে। গুমোট পরিবেশ কেটে গেছে। আকাশ ঝকঝকে পরিস্কার। জোৎ¯œার ধবধবে আলোয় ভৈরব নদের স্বচ্ছ পানি দেখা যাচ্ছে। লক্ষ্য করলাম- কয়েকটি ডাহুক পাখি ঘুরে বেড়াচ্ছে নদে। শুধু রাতে নয় দিনের বেলাতেও ব্যাপারটা আমি লক্ষ্য করেছি।
শুধু তাই নয়, দিনে এক ব্যক্তিকে কুঁচে ধরতেও লক্ষ্য করেছি। ছোট্ট ডোঙায় ভেসে ভেসে ভৈরবের ধার দিয়ে লাঠির খোঁচাতে তিনি গর্তের সন্ধান করছেন। তারপর গর্ত পেলে সেখানে বড়শি দিয়ে কুঁচে ধরছেন। ভাবলাম ভৈরবে স্বচ্ছ পানির সঞ্চার হয়েছে বলেই হয়তো তিনি তার পেশাতে ফিরতে পেরেছেন। যাহোক ছয়টি রাতের প্রত্যেকটি রাতেই আমি ডাহুক পাখির ডাক শুনতে পেয়েছি। মনোমুগ্ধ এমন ডাকে আমাকে মহোগ্রস্থ করে তুলত। ভৈরব নদ সংস্কারের কিঞ্চিৎ সুফল যশোর শহরের মানুষ পেতে শুরু করেছে ব্যাপারটি ভাবতে ভালোই লাগছিল। চির ব্যস্ত শহর যশোরের প্রাণ কেন্দ্রের ভৈরব নদে এখন ডাহুক পাখি। সেই সাথে মাছরাঙ্গা, বকসহ নানান পাখপাখালির আগমন ঘটতে শুরু করেছে। নদটি পুরোপুরি সংস্কার করা হলে শহর ঘিরে নান্দনিক প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি হবে তা এই উদাহরণের মধ্যে পাওয়া গেল। যশোরের মাননীয় সাবেক জেলা প্রশাসক, বর্তমান জেলা প্রশাসক, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিকসহ সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ভৈরব নদ বাঁচানোর কার্যক্রম বাস্তবায়ন এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই নদকে প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের প্রয়োজনে বাঁচিয়ে রাখতে হবে এমনটিই সকলের কাম্য।

শাহানুর আলম উজ্জ্বল
স্টাফ রিপোর্টার
দৈনিক গ্রামের কাগজ, যশোর।
সাধারণ সম্পাদক, প্রেসক্লাব চৌগাছা, যশোর।

স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন....

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নতুন ভিজিটর

বিশ্বে করোনা ভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৫,৪৪১
সুস্থ
৮৪,৫৪৪
মৃত্যু
২,২৩৮
সূত্র: আইইডিসিআর

বিশ্বে

আক্রান্ত
১২,০৪০,৭৫৯
সুস্থ
৬,৪৪৩,৯৭৭
মৃত্যু
৫৪৪,১৪৭
©All rights reserved ©bdnewstoday
কারিগরী সহায়তা: মোস্তাফী পনি